পর্ব ৩:
ধীর পায়ে কাউন্টারে গিয়ে পাসপোর্টগুলো এগিয়ে দিলাম। অফিসার একবার চশমার ওপর দিয়ে আমাদের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন, তারপর গভীর মনোযোগে পাসপোর্ট দেখছিলেন। গম্ভীর গলায় প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়লেন, “আমেরিকায় কেন এসেছ?”
স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলাম, “শুধুই বেড়াতে।”
“এখানে তোমার পরিচিত কে আছে?”
“আমার কাজিন থাকে। ওর পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটাব এবং ওদের বাসাতেই থাকব।”
স্ত্রীর নীল রঙের অফিশিয়াল পাসপোর্টের দিকে চোখ পড়তেই কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার স্ত্রী কী করেন?”
জানালাম, “তিনি বাংলাদেশের একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক।”
সবশেষে আমাদের ফিরতি টিকিট আর থাকার মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ১৯ সেপ্টেম্বর আমাদের ফেরার দিন—টিকিটের কপিটি বাড়িয়ে দিতেই তিনি চোখ বোলালেন। আর কোনো বাড়তি কথা নয়! হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে বললেন। চোখের পলকে ছবি তোলা হলো, আঙুলের ছাপ নেওয়া হলো। ক্রমান্বয়ে ছেলে এবং স্ত্রীর পর্বও একইভাবে শেষ হলো।
নথিপত্র গুছিয়ে দিয়ে অফিসার মুখে এক চিলতে উষ্ণ হাসি ফুটিয়ে বললেন, “Welcome to America. Have a nice tour!”
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল! মাত্র তিন থেকে চার মিনিট! কোনো হেনস্তা নয়, কোনো জেরাবার জটলা নয়—যেন এক জাদুকরী ছোঁয়ায় সম্পন্ন হলো ইমিগ্রেশন! বুকের ভেতর জমাট বাঁধা সমস্ত দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সেদিন একটি বড় সত্য উপলব্ধি করলাম—এই ইমিগ্রেশন অফিসাররা হয়তো সত্যিই মানুষের মনের ভেতরের মনস্তত্ত্ব পড়তে পারেন! কে কেবল ভ্রমণের আনন্দে এসেছে, আর কার মনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে, তা মানুষের চেহারা আর চোখের দিকে তাকিয়েই তারা আঁচ করে নেন।
ইমিগ্রেশনের গণ্ডি পেরিয়ে লাগেজ বেল্টের দিকে পা বাড়ালাম। বুকের ওপর জমে থাকা যে অদৃশ্য ভারী পাথরটা এতক্ষণ আমাদের শ্বাস রুদ্ধ করছিল, তা যেন বাতাস হয়ে মিলিয়ে গেছে। ছেলেটা শক্ত করে আমার হাত ধরে আছে, স্ত্রী চওড়া মুখে একটু পেছনে পেছনে হাঁটছেন। আমরা তিনজন যেন এক নতুন পৃথিবীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জীবনের এক বর্ণিল অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছি!(চলবে)



মন্তব্য করুন