পর্ব ১:
ইচ্ছেটা বুকের গহীনে লালন করছিলাম বহু দিন ধরে। জীবনের ব্যস্ততায় সময় আর সুযোগ যেন দুটি সমান্তরাল রেখা—একটাকে ধরলে অন্যটা অনায়াসে পিছলে যায়। এভাবে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বছরের পর বছর গড়িয়ে গেল।

গত জুলাইয়ের খড়খড়ে এক দুপুরে হঠাৎ কাইয়ুমের ফোন। সে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েছে। আমাদের আর ওদের সময়ের ব্যবধান প্রায় আকাশ-পাতাল—দশ-বারো ঘণ্টার ব্যবধান পেরিয়ে নিয়মিত কথা বলা হয়ে ওঠে না। কুশল বিনিময়ের মাঝেই মনের অতলে জমানো কথাটা বলে ফেললাম—”আমেরিকা ঘুরতে আসার খুব ইচ্ছে রে।” কাইয়ুম ওপাশ থেকে একটু নিস্তব্ধ থেকে অভিজ্ঞতার সুর টেনে বলল, “আসতে চাইলে অক্টোবরের আগেই চলে আয় ভাই। এর পর থেকে কনকনে শীত শুরু হয়ে যাবে, তখন বেরোনোর জো থাকবে না।”

কাইয়ুমের কথাটি মনে বেশ নাড়া দিল। সন্ধ্যায় গিন্নিকে নিয়ে বসলাম, পরামর্শ শেষে স্থির হলো—সেপ্টেম্বরই আমাদের কাঙ্ক্ষিত মাস। টেক্সাসের প্রাণকেন্দ্র ডালাসে আমার দুই মামাতো ভাই পরিবার নিয়ে থাকে। ওদের সঙ্গে আলাপ করে চটজলদি তারিখ চূড়ান্ত করে ফেললাম।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন—তিনই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। ভোরের আলো ফোটেনি, রাত চারটে ত্রিশের আবছা অন্ধকারে ঢাকার পথ ধরে ধেয়ে চলল আমাদের গাড়ি। বিমানবন্দরে যখন পৌঁছালাম, পুবের আকাশ তখনো ঘুম ভাঙেনি। পেছনের সিটে ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে ছেলেটা তাকিয়ে ছিল, আর গিন্নি ব্যাকুল হাতে শেষবারের মতো ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল। আমাদের তিনজনের হৃদস্পন্দনে তখন এক অদ্ভুত রূপকথা ছোঁয়ার রোমাঞ্চ আর নীরব উত্তেজনা!

কাতার এয়ারওয়েজের বিশালাকার উড়োজাহাজে চেপে আমাদের দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টার যাত্রা শুরু হলো। আমাদের আসন ছিল পেছনের দিকে। মেঘের রাজ্য পেরিয়ে যখন ডানা মেলছিল বিমান, মনে হচ্ছিল সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে। মাঝে মাঝেই কৌতূহলী ছেলেটা জানালার গা ঘেঁষে শুধাত, “আব্বু, আমরা কি এখনো আকাশেই আছি?” আমি মৃদু হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম।

অবশেষে টেক্সাসের ডালাস/ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন চাকা স্পর্শ করল, তখন স্থানীয় সময় বিকেল চারটা। ঢাকা থেকে শুক্রবারের ভোরে যাত্রা শুরু করে আবার সেই শুক্রবারের বিকেলেই আমেরিকায় নামলাম! ক্যালেন্ডারের হিসাবে সময় গড়িয়েছে মাত্র ১২ ঘণ্টার মতো, অথচ ঘড়ির কাঁটা আর শরীরের জৈবিক ঘড়ি বলছে—পুরো ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে! সময় যেন আমাদের সঙ্গে এক অদ্ভুত আর চমৎকার কৌতুক করে বসল!

শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে শ্রান্তি বাসা বেঁধেছিল সত্য, কিন্তু স্বপ্নের দেশে প্রথমবার পা রাখার তীব্র শিহরণ সেই ক্লান্তি নিমেষেই উধাও করে দিল। প্লেন থেকে নামার লাইনে দাঁড়িয়ে আমরা তিনজন এক অদৃশ্য রোমাঞ্চে কাঁপছিলাম—এবার সত্যি সত্যি এক ভিন্ন পৃথিবীর মাটিতে পা রাখব!(চলবে)