পর্ব ৬:
এত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার পর ঘুম আসতে দেরি হয়নি। বিছানায় শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ দুটো ভারী হয়ে এসেছিল। গভীর নিদ্রায় ডুবে গিয়েছিলাম আমরা।
রাত প্রায় একটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। শরীরে হালকা শীত শীত ভাব। পুরো বাড়ি সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং-এ ঢাকা, অথচ ঘুমানোর আগে তাপমাত্রা ঠিক করে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। একটু একটু খিদেও টের পাচ্ছিলাম। পাশ ফিরে দেখি গিন্নিও জেগে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম,
“কী হলো? ঘুম হয়নি?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎই চোখ খুলে গেল।”
বুঝতে পারলাম, তারও খিদে পেয়েছে, শুধু একটু বলতে দ্বিধা করছেন। আমি তাই সোজাসুজি বলে ফেললাম,
“আমারও একটু খিদে পেয়েছে। এখন অনেক রাত, ওদের ডাকা ঠিক হবে না।”
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“আমারও একই অবস্থা।”
ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আর ডাকতে সাহস হলো না। আমরা দুজনেই আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম।
গিন্নি বললেন,
“মৌরি (ফারিয়াজের স্ত্রী) ঘুমানোর আগে বলেছিল, ফ্রিজে ব্রেড, ক্রুয়াসাঁ, বাটার, সেদ্ধ ডিম, ফল, জ্যাম, জুস, চিকেন পাস্তা—সবই আছে। রাতে খিদে লাগলে খেয়ে নিـও। এত বড় যাত্রা করে এসেছো, খিদে লাগার সম্ভাবনা আছে।”

ফ্রিজ খুলে দেখলাম সত্যিই নানা রকম খাবারে ভরা। বোঝা যাচ্ছিল, বাচ্চাদের জন্য সবসময় এমন খাবার মজুদ রাখা হয়। আমরা দুটি ব্রেডে বাটার লাগিয়ে সেদ্ধ ডিম খেয়ে নিলাম। পেট একটু শান্ত হলো। পানি খেয়ে ঘরে ফিরে এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা করলাম। ওদের এসি ফারেনহাইট স্কেলে কাজ করে, আমাদের দেশের সেলসিয়াসের মতো নয়। বেশি সময় নষ্ট না করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
সকাল সাতটার দিকে চোখ খুলল। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া উজ্জ্বল সূর্যালোকে মনটা হঠাৎ ফুরফুরে হয়ে উঠল। গিন্নিকে ডাকলাম। দুজনে ফ্রেশ হয়ে বাড়ির পেছনের ব্যাকইয়ার্ডে বেরিয়ে গেলাম। আগের দিন সন্ধ্যায় ক্লান্তিতে কিছুই ঠিকমতো দেখতে পারিনি। এখন সকালের বাতাসটা মনোরম। বাইরের তাপমাত্রা গরমও নয়, ঠান্ডাও নয়—ঠিক যেন একটা নিখুঁত শরতের সকাল। চকচকে রোদ, বিশাল নীল আকাশ, পরিপাটি ব্যাকইয়ার্ড। এক কোণায় ছোট একটি সুইমিং পুল। পুলের পাশে একটি ক্ষুদ্র ঝর্ণা থেকে অনবরত পানি ঝরছে; সেই মৃদু শব্দ পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলছে।
ধীরে ধীরে পুরো ব্যাকইয়ার্ড ঘুরে দেখলাম। বাড়ির পেছনে দুটি গাড়ি রাখা। তার পাশে বাচ্চাদের জন্য একটি বাস্কেটবল রিং লাগানো। এদিক-ওদিক কয়েকটি ফুটবল পড়ে আছে। পেছনের গেটের কাছে একটি ডাস্টবিন—বুঝলাম এখান থেকেই ময়লা সংগ্রহের গাড়ি আসে। বাড়ির একপাশে ছোট্ট একটি বাগান। সুইমিং পুলের পাশে কয়েকটি টবে ফুলের গাছ। নাম না জানা কিছু ফুলও চোখে পড়ল। বাগানের এক কোণায় দেখলাম দেশি লাউয়ের মাচা। আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল একটি তাজা দেশি লাউ! সুদূর প্রবাসের মাটিতে আমাদের দেশের সবজি দেখে মনটা এক পলক জুড়িয়ে গেল, মনে হলো এইমাত্র যেন এক টুকরো বাংলাদেশকেই ছুঁয়ে ফেললাম।
তারপর পেছনের গেট খুলে বাইরে পা রাখতেই চোখ আরও প্রসারিত হলো।

রাস্তাটা এত ঝকঝকে পরিষ্কার যে মনে হচ্ছিল এইমাত্র কেউ ঝাড়ু দিয়ে মুছে রেখে গেছে। কোথাও একটি ঝরা পাতাও নেই। চারদিকে নিস্তব্ধতা। রাস্তার ওপারে ঘন গাছপালা, কোনো বাড়িঘর নেই। গুগল সার্চ করে জানলাম, এটি ব্রেকনরিজ পার্ক—টেক্সাসের রিচার্ডসন শহরে অবস্থিত ৪১৭ একর আয়তনের একটি বিশাল উন্মুক্ত পার্ক। তখন বুঝতে পারলাম, আমি যেটিকে ‘ব্রেকনরিজ এলাকা’ বলে জানতাম, সেটি আসলে ডালাসের পার্শ্ববর্তী রিচার্ডসন শহরের নতুন একটি আবাসিক এলাকা। চারপাশের সব বাড়িই নতুন, রাস্তাঘাট ছবির মতো সুন্দর।
রোদের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করল। হালকা খিদেও টের পাচ্ছিলাম। তাই আর দেরি না করে বাড়িতে ফিরে সোজা রান্নাঘরে চলে গেলাম। ওরা কেউ এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি—একদিকে সরকারি ছুটি, অন্যদিকে রাত জেগে সিনেমা দেখেছে। তাই ওদের বিরক্ত না করে ফ্রিজ থেকে ফ্রোজেন পরোটা, ডিম আর চিকেন কারি বের করে নিজেরাই নাস্তা তৈরি করে খেয়ে নিলাম।
তারপর চা বানিয়ে সুইমিং পুলের পাশের ছায়ায় এসে বসলাম। চায়ের কাপ হাতে দুজনে গল্প করতে করতে নতুন দেশের সকালকে উপভোগ করতে লাগলাম। এমন সময় হঠাৎ— (চলবে…)




মন্তব্য করুন