পর্ব ২:
পেছনের সিটে বসার মাশুল গুনতে হচ্ছিল, উড়োজাহাজ থেকে বের হতেই বেশ খানিকটা বিলম্ব হলো। অবশেষে ক্যারি-অন লাগেজ হাতে আমরা দীর্ঘ ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। একদিকে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে শরীর ভারী, অন্যদিকে নতুন এক মহাদেশকে জানার অদম্য আনন্দ। আর এই দুইয়ের মাঝে তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধছিল এক অজানা মনস্তাত্ত্বিক চাপ—ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখোমুখি হওয়া!
দেশ ছাড়ার আগে অনেকের মুখেই শুনেছি, প্রথমবার টুরিস্ট ভিসায় আমেরিকায় ঢুকতে গেলে নাকি নানা অজুহাতে হেনস্তার শিকার হতে হয়। মাথার ভেতর সেই পুরোনো আশঙ্কাগুলো বারবার উঁকি দিচ্ছিল, যদিও স্ত্রীর সামনে নিজেকে বেশ সাহসী ও স্বাভাবিক দেখানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আর আমাদের ছোট ছেলেটা? অসীম সাহসে দুটো ভারী ক্যারি-অন লাগেজ একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সামনে; তার মায়ের হাত থেকে লাগেজ ছুঁতেই দিচ্ছিল না, চোখেমুখে তার কেবলই জয়ের আনন্দ!
পাসপোর্ট আর প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাতে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছেলেটার কৌতূহলের অন্ত নেই, একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—”আব্বু, ওই লোকটা কী করছে?”, “আব্বু, আমরা এখন কোথায় যাব?” মন তখন ইমিগ্রেশন কাউন্টারের আশঙ্কায় ব্যাকুল, তাই ঠিকঠাক জবাবও দেওয়া হচ্ছিল না।
হঠাৎ এক বন্ধুর দেওয়া পরামর্শ মনে পড়ে গেল। সে বলেছিল, “শোন, সাদা বা কালো চামড়ার অফিসারদের কাউন্টার এড়িয়ে চলবি। কোনো বাদামি চামড়ার অফিসার পেলে ওখানেই দাঁড়াবি, ওরা একটু সদয় হয়, হয়রানি কমায়।” চারপাশের কাউন্টারে চোখ বোলালাম—দুটিতে শ্বেতাঙ্গ অফিসার, একটিতে কৃষ্ণাঙ্গ। আর একটি কাউন্টার সম্পূর্ণ ফাঁকা। মনে মনে ভাবলাম, আজ বুঝি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইমিগ্রেশনের ঘানি টানতেই হবে!
ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন অলৌকিক ঘটনা ঘটল! ফাঁকা কাউন্টারটিতে এসে বসলেন এক বাদামি চামড়ার অফিসার। বসে আমাদের দিকেই হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। বুকের ওপর চেপে বসা আশঙ্কার বিশাল পাথরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে গেল! হৃদপিণ্ডটা নিচু স্বরে বলে উঠল—”চল, এবার দেখা যাক destiny কী বলে!”



মন্তব্য করুন