আমার জন্ম নানাবাড়িতে। বলা যায়, জীবনের শুরু থেকেই আমি এক ভাড়াটিয়া, নানার ভিটায় আশ্রয় নেওয়া এক অনাহূত অতিথি।
সময়টা ১৯৭১ সাল। চারপাশে মুক্তিযুদ্ধের দাবানল। যতটুকু স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়, সেই উত্তাল দিনগুলোতেই বাবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যাশায়ী; জটিল অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর মুখোমুখি। নানাবাড়ির অদূরেই শুভপুর ব্রিজ। যেদিন সেই ব্রিজে বোমা পড়ে কেঁপে উঠল চারপাশ, তার দু-এক দিনের মধ্যেই আমাদের পরিবারটি ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে গেল নানা দিকে।
আমরা বাধ্য হয়ে গেলাম আমাদের তথাকথিত ‘নিজের বাড়ি’তে। শুনেছিলাম সেখানে নাকি আমাদের জায়গা আছে, কিন্তু কোনো ঘর নেই। মানুষের ভিটেমাটি থাকে অথচ মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে না, জীবনের এই নির্মম ও শাশ্বত সত্যটি আমি সেদিনই প্রথম অনুধাবন করেছিলাম। উঠলাম বাবার চাচাতো ভাইদের ঘরে। কিছুদিন পর আমাদের জন্য একটা ছোট ঘর তোলা হলেও আমরা সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতাম যার যার মতো। নিজের ঘর, তবুও যেন সে ঘর নিজের ছিল না কোনোদিন।
স্বাধীনতার বছরদুয়েক পর আমরা থিতু হওয়ার আশায় চলে এলাম চট্টগ্রাম শহরে। আর অমনি শুরু হলো যাযাবর জীবনের চিরচেনা অধ্যায়—বাসা বদল। এক বাসা থেকে অন্য বাসা, এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লা; এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এসে পৌঁছালাম ঢোবার দক্ষিণ পাড়ে। তখনো আমরা বাবার বটছায়ায়। বাবা ছিলেন আমাদের মাথার ওপরের এক বিশাল ছাদ। কিন্তু বাবা চাকরি থেকে অবসর নিতেই সেই বটছায়া আর ছাদ দুটোই যেন সরে গেল বড় ভাইয়ের কাঁধে। বড় ভাই আমাদের আগলে রাখলেন পরম মমতায়।
এর মাঝে জীবনের তাগিদে ও রূঢ় প্রয়োজনের তাড়ে বাবা তাঁর সারা জীবনের সম্বলটুকু একে একে বিক্রি করে দিলেন, নানাবাড়িতে কেনা জমি থেকে শুরু করে গ্রামের বাড়ির ভিটেমাটির এটুকুন অংশও। প্রয়োজন বড্ড নিষ্ঠুর ও নির্দয়; সে কোনো জমির দলিল চেনে না, কোনো আবেগ বা মধুর স্মৃতিও স্মরণে রাখে না।
বিয়ের পরও ২০০৭ সাল পর্যন্ত আমি বড় ভাইয়ের সাথেই ছিলাম, তাঁরই পরম স্নেহের ছায়াতলে। তারপর শুরু হলো আমার নিজস্ব আলাদা পথচলা, শ্বশুরের একটা ভাড়া বাসায়। সংসার হলো আমার নিজের, কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁইটি থেকে গেল অন্যের।
২০১০ সাল থেকে আজ অবধি—দীর্ঘ ১৬টি বছর ধরে আমি চট্টগ্রামের বড় পুকুর পাড়ের এই একই ভাড়া বাসায় বাস করছি। আজও দেওয়ালে একটা পেরেক ঠুকতে গেলে হাত থমকে যায়, মন বলে ওঠে,‘এটা তো তোমার নিজের ঘর নয়!’
আজ যখন ‘দালানকোঠা’ পত্রিকার জন্য কলম ধরলাম, হঠাৎ করে নিজের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল। প্রতিদিন এই নগর সভ্যতা, ইট-কাঠের অট্টালিকা আর দালানকোঠা নিয়ে কত শত বাক্য বুনে চলছি; অথচ দিনশেষে নিজেরই একটা দালানকোঠা হলো না!
আমার বাবারও কোনো দালানকোঠা ছিল না, আমারও হলো না। তবুও বুকচিরে কোনো দীর্ঘশ্বাস বা আক্ষেপ বের হয় না। কারণ আমি বুঝে গেছি, দালানকোঠা কেবল ইট, বালু আর সিমেন্টের নির্জীব খাঁচা দিয়ে তৈরি হয় না; আসল দালানকোঠা গড়ে ওঠে ভালোবাসা দিয়ে। বড় ভাইয়ের যে নীড়ে শৈশব-কৈশোর কেটেছে, শ্বশুরের যে ভাড়া বাসায় আজ আমার সংসার—সেখানে পরম ভালোবাসার অভাব হয়নি কোনোদিন। হতে পারে কোনো রাজউক বা সিডিএর দলিলে আমার নাম লেখা নেই, কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতিকাব্যে আমার নামটা খোদাই করা আছে ঠিকই।
আজ এই ব্যস্ত ও ইট-কাঠের শহরে আমার মতো হাজারো ‘ফরিদ’ বাস করে, যাদের দলিলে লেখা নিজস্ব কোনো ঘর নেই; কিন্তু অন্যের পরবাসকে পরম মমতায় আপন করে নেওয়ার মতো বিশাল একটা হৃদয় আছে।
আমাদের মাথার ওপর হয়তো আকাশছোঁয়া অট্টালিকা নেই, কিন্তু আমাদের মনটা যে ওই খোলা আকাশের চেয়েও অনেক বেশি বড়!



মন্তব্য করুন