পর্ব ৪:
লাগেজ বেল্টের সামনে তখন দেশ-বিদেশের অনেক মানুষের ভিড়। ট্রলি খুঁজতে গিয়ে ছেলেটা হুট করে বলল,
“আব্বু, আমি একটা ট্রলি নিয়ে আসি?”
স্মিত হেসে সায় দিলাম। সে বেশ উৎসাহ নিয়ে দৌড়ে গেল। কিন্তু মিনিটখানেক পরেই তার মুখটা আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। ফিরে এসে হতাশার সুরে বলল, “বাবা, সব ট্রলিতেই তো শিকল আর তালা দেওয়া! একটাও বের করতে পারলাম না।”

অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি—সত্যিই তো! প্রতিটি ট্রলি সেন্সর দিয়ে লক করা। আমাদের দেশে বিমানবন্দরে ট্রলি ব্যবহারের জন্য কোনো অর্থ গুণতে হয় না, নিখরচায় মেলে। কিন্তু এখানে ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চ করে নির্দিষ্ট ডলার পরিশোধ না করলে ট্রলির তালা খোলে না! খুব ছোট একটা বিষয়, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পরিবারের জন্য এটি ছিল এক নতুন বাস্তবতার ধাক্কা।

সামান্য বিব্রত বোধ করলাম, অচেনা জায়গায় সাহায্য চাওয়ার মতো কাউকেও পাচ্ছিলাম না। ঠিক তখনই একটু দূরে চোখ যেতেই দেখলাম—দুটো ট্রলি কে যেন জোড়া অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে! দৌড়ে গিয়ে সেগুলোকে টেনে আলাদা করার কম চেষ্টা করলাম না, কিন্তু সব ব্যর্থ! শেষমেশ অগত্যা সেই জোড়া ট্রলিটাকেই ঠেলে এনে আমাদের ভারী লাগেজগুলো ওটার ওপর তুলে নিলাম। তারপর অ্যারাইভাল গেটের দিকে ধীর পায়ে এগোতে লাগলাম।

হ্যাঁ, আমেরিকার মাটিতে পা রাখার পরেই এটিই ছিল আমাদের প্রথম বিস্ময় এবং প্রথম চমক!
বিমানবন্দরের ভেতরের চারপাশটা যেন এক নিস্তব্ধ ক্যানভাস—বিশাল, অসম্ভব পরিষ্কার আর শান্ত। হাজারো মানুষ ব্যস্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, কিন্তু কোথাও এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই, কারো সাথে কারো গায়ের ধাক্কা লাগছে না। প্রতিটি মানুষ যেন নিজ নিজ বলয়ে আচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলিত। আমরা তিনজন ট্রলি ঠেলে ঠেলে এগোনোর সময় ছেলেটা বারবার পেছন ফিরে অবাক চোখে দেখছিল—আমরা সত্যি সত্যিই সেই স্বপ্নের দেশে এসে পৌঁছেছি তো?

অ্যারাইভাল গেটের কাছে এসে মনে হলো, এটি তো কেবল ভূমিকা। পুরো আমেরিকা, তাদের সুশৃঙ্খল নগর, যান্ত্রিক নাগরিক জীবন, সমাজব্যবস্থা এবং বিশাল আর্থসামাজিক রূপরেখা—অনেক কিছু দেখা ও বোঝার বাকি এখনো।
গেটের অটোমেটিক কাঁচের দরজা পেরিয়ে আমরা বাইরে পা রাখলাম। টেক্সাসের রোদ আর নতুন আলোয় প্রথমবার আমাদের চোখ দুটো কিছুটা কুঁচকে গেল!
(চলবে…)