বাংলাদেশের রক সংগীতের আকাশের জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র, কোটি তরুণের হৃদয়ের স্পন্দন এবং কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর আজ অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল তাঁর জাদুকরী আঙুলের ছোঁয়া; অভিমান করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই সংগীত জাদুকর। দেখতে দেখতে আটটি বছর পার হয়ে গেলেও কোটি ভক্তের হৃদয়ে তাঁর স্থান একটুও ম্লান হয়নি। আজ অশ্রুসজল চোখে, বুকভরা ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধায় সারা দেশের সংগীতপ্রেমীরা স্মরণ করছেন তাঁদের প্রিয় ‘এবি’কে।

আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা রক মিউজিকের এক বৈপ্লবিক অধ্যায়। ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই অনন্য প্রতিভা আশির দশকে ‘ফিলিংস’ ও পরে ‘সোলস’-এর হয়ে পথচলা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে গঠিত তাঁর স্বপ্নের ব্যান্ড ‘এলআরবি’ (লিটল রিভার ব্যান্ড)-এর মাধ্যমে তিনি দেশের সংগীত অঙ্গনে নতুন ধারার সৃষ্টি করেন।

তাঁর আঙুলে গিটার কথা বলতো, আর গলার কণ্ঠে ঝরে পড়তো সুরের বৃষ্টি। “চলো বদলে যাই”, “রুপালি গিটার”, “কষ্ট পেতে ভালোবাসি”, “হাসতে দেখো গাইতে দেখো”, “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে”—এমন শত শত অমর গান তিনি উপহার দিয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

সংগীত, দেশপ্রেম ও দেশ-বিদেশের কনসার্ট: আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অখণ্ড দেশপ্রেমের প্রতীক। দেশীয় সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিতে তিনি ছিলেন নিরলস। দেশ-বিদেশের অগণিত মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে বুকে ধারণ করে যখন তিনি গিটারে ঝড় তুলতেন, তখন বিদেশের মাটিতেও তৈরি হতো নতুন এক বাংলাদেশ। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ভারতের মঞ্চগুলোতে তাঁর কনসার্ট মানেই ছিল হাজার হাজার উন্মাতাল শ্রোতার ঢল। তাঁর গিটারের একক পরিবেশনা বিশ্বসংগীতের মঞ্চেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মানবতা ও তরুণের অনুপ্রেরণা: সংগীতের রাজপুত্র হওয়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন এক পরম উদার ব্যক্তিত্ব। নতুনদের সুযোগ করে দেওয়া, নতুন গিটারিস্ট তৈরি করা এবং তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রেখে সংগীতে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তরুণদের তিনি বলতেন, “ভালোবাসাই সব বদলাতে পারে।” অনেক দুঃস্থ শিল্পী ও মানুষের পাশে তিনি নীরবে দাঁড়িয়েছেন, যা তাঁর মানবিক সত্তাকে আরও মহিমান্বিত করেছে।

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও, টিভিসহ দেশজুড়ে ভক্তকুল ও সংগীতানুরাগীরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন। রেডিও আর স্পিকারগুলোতে বেজে চলেছে তাঁর অমর সুরের লহরী।

সত্যিই, “হাসতে দেখো, গাইতে দেখো, অনেক তো দেখেছো…” গানটির মতোই তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু নিজের পেছনে রেখে গেছেন এক অমর সুরের সামাজ্য। শরীরের বিনাশ হলেও, যে রুপালি গিটার তিনি ফেলে গেছেন, তার প্রতিটি তারে আজও প্রতিধ্বনি হয় আইয়ুব বাচ্চুর নাম। তিনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে, চিরকালের জন্য।